প্রাথমিক বিদ্যালয় অনলাইনে বদলি ভোগান্তি, ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা

প্রাথমিক বিদ্যালয় অনলাইনে বদলি ভোগান্তি, ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা

0
17
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনলাইনে বদলির আবেদন নেওয়া হচ্ছে। শনিবার (৩০ মার্চ) শুরু হয়েছে এ আবেদন, যা চলবে সোমবার (১ এপ্রিল) পর্যন্ত। অর্থাৎ, আবেদনের জন্য মাত্র তিনদিন সময় পাচ্ছেন শিক্ষকরা। স্বল্পসময়ে অনলাইনে আবেদন করতে গিয়ে পদে পদে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তারা।
ওটিপি না আসায় আবেদন করতে পারছেন না বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকরা

# সার্ভার-সফটওয়্যারের ত্রুটিতে আটকা শিক্ষকরা
# হটলাইনে নম্বর কল দিলেও মিলছে না সহায়তা
# বদলি নির্দেশিকার নিয়মের ফাঁদে নতুন শিক্ষকরা
# অনলাইন আবেদনের সময়সীমা বাড়ানোর দাবি

সার্ভার জটিলতা, নিয়মের ‘ফাঁদ’ এবং ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) না আসায় আবেদন করতে পারছেন না বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকরা। এমন পরিস্থিতিতে অনলাইন আবেদনের সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

অনলাইনে আবেদন শুরুর পর থেকেই নির্ধারিত সার্ভার ডাউন। অনেক চেষ্টা করে ঢুকতে পারলেও আবেদন করা যাচ্ছে না। কখনো দেখানো হচ্ছে, ‘এ মুহূর্তে বদলি আবেদন চালু নেই’, আবার কখনো ‘বদলির সময়সীমা সমাপ্ত হয়ে গেছে’ দেখাচ্ছে। কেউ কেউ আবার ফরম পূরণ করে ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে হয়রান

ভুক্তভোগী শিক্ষকরা বলছেন, অনলাইনে আবেদন শুরুর পর থেকেই নির্ধারিত সার্ভার ডাউন। অনেক চেষ্টা করে ঢুকতে পারলেও আবেদন করা যাচ্ছে না। কখনো দেখানো হচ্ছে, ‘এ মুহূর্তে বদলি আবেদন চালু নেই’, আবার কখনো ‘বদলির সময়সীমা সমাপ্ত হয়ে গেছে’ দেখাচ্ছে। কেউ কেউ আবার ফরম পূরণ করে ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে হয়রান। পাশাপাশি বদলির নিয়মে কিছু সংযোজন করা হলেও সার্ভারে তা আপডেট না করায় নতুন শিক্ষকরা আবেদন করতে পারছেন না।

 

 

অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দাবি, একযোগে অনেকে সার্ভারে ক্লিক করায় মাঝেমধ্যে সমস্যা হচ্ছে। অনেকে সফলভাবে আবেদন করেছেন। সার্ভারের জটিলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য তারা চেষ্টা করছেন। তারপরও যদি বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষক থাকেন এবং তারা আবেদন করতে না পারেন, সেক্ষেত্রে সময়সীমা বাড়ানো হতে পারে।

 

  • অধিদপ্তর সূত্র ও প্রাথমিকের শিক্ষক নেতারা জানিয়েছেন, সারাদেশে বর্তমানে ৬৫ হাজার ৫৬৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এতে শিক্ষকের সংখ্যা তিন লাখ ৫৯ হাজারের বেশি। তাদের অর্ধেকই বদলিপ্রত্যাশী।

সার্ভার জটিলতায় ভোগান্তি

২০২২ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সমন্বিত অনলাইন বদলি নির্দেশিকা করা হয়। সেই নির্দেশিকা অনুযায়ী ওই বছরের সেপ্টেম্বরে প্রথমবার অনলাইনে আন্তঃউপজেলা বদলির আবেদন নেওয়া হয়। সেসময় আবেদন করতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন শিক্ষকরা। এরপর আরও দুই দফা অনলাইনে বদলির আবেদন নেওয়া হলেও নানা অভিযোগ ওঠে।

পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন করেন প্রতিমন্ত্রী রুমানা আলী

মুন্সিগঞ্জের ভবেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. আলমগীর  বলেন, ‘প্রথম থেকেই অনলাইনে আবেদন করার চেষ্টা করছি। এক এক সময় এক এক জটিলতার কথা জানানো হচ্ছে। আবেদন করতে ওয়েবসাইটে ঢুকলে বদলি কার্যক্রম চালু নেই লেখা দেখাচ্ছে। আবার সব কাজ শেষ করে সাবমিট করলে দেখানো হচ্ছে- প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি, অনুগ্রহ করে আবার চেষ্টা করুন।’

 

বদলিটা আমার খুবই দরকার। নারী হয়ে দূরের স্কুলে যাতায়াত করা কষ্টকর। শনিবার সকাল থেকে চেষ্টা করেও আবেদন সম্পন্ন করতে পারিনি। অনেকের কাছে সহায়তা চেয়ে যোগাযোগ করেছি, কেউ সহায়তা করতে পারছেন না। অধিদপ্তরের দেওয়া হটলাইন নম্বরেও কল করেছি বহুবার। কখনো ব্যস্ত দেখাচ্ছে নম্বর, আবার কখনো কল ঢুকলেও রিসিভ হচ্ছে না

 

টাঙ্গাইলের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে  বলেন, ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইনে বসে আবেদন শেষ করতে পারছি না। আবার সময়ও হাতে বেশি নেই। এত অল্প সময় দেওয়ায় সবাই একসঙ্গে আবেদন করতে ওয়েবসাইটে ঢুকছেন। সেজন্য হয়তো সমস্যাটা আরও বাড়ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশে এমন ভোগান্তিতে পড়তে চাই না আমরা।’

সফটওয়্যারে ত্রুটি, আটকে যাচ্ছেন শিক্ষকরা

সমন্বিত বদলি নীতিমালার ৩.৩ ধারায় ‘অথবা’ দিয়ে দুটি শর্ত দেওয়া হয়েছে। এর যে কোনো একটি পূরণ করলেই আবেদন করতে পারার কথা। শিক্ষকরা বলছেন, দুটি শর্ত পূরণ না হলে আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে না। এটি নীতিমালার কারণে নয়, সফটওয়ারের ত্রুটির কারণে হচ্ছে। অনেকের চাকরির বয়স ১০ বছর পূর্ণ হলেও তথ্য অ্যান্ট্রি করতে পারছেন না।

এছাড়া সমন্বিত বদলি নির্দেশিকার ৩.৪ ধারায় বলা হয়েছে, যেসব বিদ্যালয়ে চার বা তার কম সংখ্যক শিক্ষক কর্মরত, কিংবা শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:৪০-এর বেশি রয়েছে, সেসব বিদ্যালয় থেকে সাধারণভাবে শিক্ষক বদলি করা যাবে না। নীতিমালার এ অংশ পূরণ না করার ফলে অনেক শিক্ষক আবেদন করতে পারছেন না।

সিরাজগঞ্জের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ইসরাত জাহান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সহকারী শিক্ষক হিসেবে আমার চাকরির বয়স ১০ বছরেরও বেশি। তা-ও বদলির তথ্য অ্যান্ট্রি হচ্ছে না কেন, বুঝতে পারছি না। বিষয়টি নিয়ে কেউ কিছু জানাতেও পারছেন না।’

অনলাইনে বদলি আবেদনে পদে পদে ভোগান্তি, ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা

শরীফা আক্তার সুমি নামে আরেক শিক্ষক  বলেন, ‘নীতিমালায় বলা হয়েছে, যোগদান থেকে চাকরির বয়স দুই বছর পূর্ণ হলেই বদলির আবেদন করা যাবে। আমার দুই বছরের বেশি। অথচ এখন কোনোভাবেই অনলাইনে আবেদন করা যাচ্ছে না।’

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পলিসি অ্যান্ড অপারেশন বিভাগের পরিচালক মনীষ চাকমা বলেন, ‘সফটওয়্যারে কোনো ত্রুটি আছে বলে মনে হয় না। একসঙ্গে বেশি মানুষ ওয়েবসাইটে ক্লিক করায় সার্ভার ডাউন হয়ে পড়ছে। অনেক সময় সঠিক সেবাটি পাচ্ছেন না শিক্ষকরা। তবুও আমরা সার্ভার স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি।’

হটলাইনে মিলছে না সাড়া

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনলাইনে বদলি সংক্রান্ত সহায়তা দিতে বিভাগভিত্তিক হটলাইন চালু করেছে অধিদপ্তর। সেখানে চারজন কর্মকর্তাকে সমন্বয় করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সহায়তা নিতে যে নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করা হয়েছে, সেগুলোতে কল করলেও রিসিভ হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা। ফলে সমস্যায় পড়লেও তা জানাতে এবং সমাধানের পথ পাচ্ছেন না বদলিপ্রত্যাশীরা।

  • চাঁদপুরের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাসলিমা ভুইয়া। তিনি বারবার চেষ্টা করেও আবেদন করতে পারছেন না। বিষয়টি নিয়ে সহায়তা পেতে প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রায় তিন লাখ সদস্যের একটি গ্রুপে তিনি পোস্ট দিয়েছেন।

যোগাযোগ করা হলে তাসলিমা বলেন, ‘বদলিটা আমার খুবই দরকার। নারী হয়ে দূরের স্কুলে যাতায়াত করা কষ্টকর। শনিবার সকাল থেকে চেষ্টা করেও আবেদন সম্পন্ন করতে পারিনি। অনেকের কাছে সহায়তা চেয়ে যোগাযোগ করেছি, কেউ সহায়তা করতে পারছেন না। অধিদপ্তরের দেওয়া হটলাইন নম্বরেও কল করেছি বহুবার। কখনো ব্যস্ত দেখাচ্ছে নম্বর, আবার কখনো কল ঢুকলেও রিসিভ হচ্ছে না।’

 

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) শাহ রেজওয়ান হায়াত বলেন, আবেদন করার জন্য আরও একদিন সময় আছে। দেখা যাক, কতগুলো আবেদন পড়ে। যদি দেখা যায় আবেদন কম পড়েছে কিংবা আবেদন করতে না পেরে অনেকে যোগাযোগ করছেন, সেক্ষেত্রে সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে

 

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান তুহিন বলেন, ‘সারাদেশ থেকে কল আসছে। সেজন্য হয়তো দায়িত্বপ্রাপ্তরা মাঝে মাঝে হিমশিম খাচ্ছেন। তারা সহায়তা করার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন।’

সময়সীমা বাড়ানোর দাবি

অনলাইনে আবেদনে পদে পদে ভোগান্তিতে পড়ে সফলভাবে আবেদন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে না পারায় সময়সীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকরা। তারা আরও তিনদিন সময় বাড়িয়ে অনলাইনে বদলি নেওয়া এবং সার্ভার সচল রাখার ব্যবস্থা নিতে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের অনুরোধ জানিয়েছেন।

অনলাইনে বদলি আবেদনে পদে পদে ভোগান্তি, ক্ষুব্ধ শিক্ষকরাঅনলাইনে বদলির আবেদন নিয়ে ভোগান্তিতে প্রাথমিক শিক্ষকরা

প্রাথমিক শিক্ষকদের দশম গ্রেড বাস্তবায়ন কমিটির সমন্বয়ক মু. মাহবুবর রহমান। শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নেতৃত্ব দেন তিনি। মু. মাহবুবর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সারাদেশে সাড়ে তিন লাখের বেশি শিক্ষক। যদি দেড় লাখ শিক্ষকও আবেদন করতে ওয়েবসাইটে ঢোকেন, স্বাভাবিকভাবেই সার্ভার ডাউন হবে। এজন্য বেশি সময় দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া আবেদনটা যেহেতু অনলাইনে, এটা সবসময় চালু রাখা প্রয়োজন।’

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) শাহ রেজওয়ান হায়াত  বলেন, ‘আবেদন করার জন্য আরও একদিন সময় আছে। দেখা যাক, কতগুলো আবেদন পড়ে। যদি দেখা যায় আবেদন কম পড়েছে কিংবা আবেদন করতে না পেরে অনেকে যোগাযোগ করছেন, সেক্ষেত্রে সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।’

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY